Friday, 1 May 2015

সালফে-সালেহীন গণ কুরআন-হাদীছ যেভাবে বুঝেছেন ও আমল করেছেন সেই বুঝই নিতে হবে ও আমল করতে হবে

সালফে-সালেহীন গণ কুরআন-হাদীছ যেভাবে বুঝেছেন ও আমল করেছেন সেই বুঝই নিতে হবে ও আমল করতে হবে

কুরআন ও হাদীছের ব্যাখ্যা ও বুঝ নিয়ে বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন মত দেখা যায়। কেউ বলেন এই ব্যাখ্যা ছহীহ, কেউ বলেন ঐটা ছহীহ। কেউ বলেন হাদীছের শাব্দিক অর্থ নেয়া যাবে না, আবার কেউ বলেন শাব্দিক অর্থই নিতে হবে। মাঝখানে আমরা সাধারণ মানুষ বিপাকে পড়ে যাই কী করব? 

অনেককেই বলতে শোনা যায়, এই হাদীছ কুরআনের বিপরীত তাই পরিত্যাজ্য!!! (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক)। অথচ, আল্লাহর অহী কখনোই পরস্পর বিপরীত হয় না। ইমাম শাফে‘ঈ (রহঃ) বলেছেন,
“কোন ভাবেই রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সুন্নাত আল্লাহর কিতাবের খেলাফ হতে পারে না”
(আর-রিসালাহ ১/৫৪৬)।

ইমাম ইবনে খুযায়মাহ (রহঃ) বলেছেন,
“আমি এমন কোন ছহীহ হাদীস জানি না যা পরস্পরের বিরোধী। যদি কোন ব্যক্তি (ছহীহ হাদীছে) বিরোধ মনে করে, সে যেন আমার কাছে সেটা নিয়ে আসে। তাহলে তাদের পারস্পরিক (সমাধানের) অবস্থাগুলো দেখব”
(হাফেয ইরাক্বী, শরহে তাবসিরাহ ও তাযকিরাহ; সিদ্দিক হাসান খান, মিনহাজুল উসূল ইলা ইসলাহী আহাদীছির রাসূল)।

অনেকে আবার দ্বিধাদন্দ্বে পড়ে গিয়ে নিজের নফসের অনুসরণ করতে থাকে এবং একপর্যায়ে পথভ্রষ্ট হয়। বর্তমানে যেভাবে কুরআন-হাদীছের অপব্যাখ্যা চলছে, তার উদাহরণ ভূরি ভূরি ।

তাই এ সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে সালফে-সালেহীনের বুঝ গ্রহণ করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। সালফে-সালেহীন বলতে বুঝায় ছাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈ ও তাবে-তাবেঈদের।
ছাহাবীদের ব্যাপারে আমরা কমবেশ জানি। তারপরও কিছু ছাহাবায়ে কেরাম রয়েছেন যাদের দ্বারা দ্বীনের হুকুম-আহকাম ব্যাপকভাবে প্রসারিত হয়েছে। এরা হলেন, হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ), হযরত আলী ইবনে আবী তালেব (রাঃ), হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাঃ), উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ), হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রাঃ), হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) প্রমুখ।

তাবেঈগ ণের উদাহরণ হচ্ছে- সাঈদ ইবনে আল-মুসায়্যিব, উরওয়া ইবনে যুবাইর, হাসান বসরী, মুজাহিদ ইবনে জাবর, সাঈদ ইবনে যুবায়ের, ইবনে আব্বাসের ক্রীতদাস ইকরিমা, ইবনে উমরের ক্রীতদাস নাফে, ইবরাহীম নখঈ, ইবনে সিরীন।

তাবে-তাবেঈগণের উদাহরণ হচ্ছে- ছাওরী, মালেক, রাবিআ, ইবনে হুরমুয, হাসান ইবনে সালেহ, আব্দুল্লাহ ইবনে হাসান, ইবনে আবু লাইলা, ইবনে শুবরুমা, আল-আওযায়ী।

স্বাভাবিকভাবেই তারা কুরআনের কোন আয়াত নাযিলের প্রেক্ষাপট ও কারণ সম্পর্কে আমাদের চেয়ে বেশি অবগত ছিলেন। অনুরূপভাবে হাদীছের ব্যাখ্যাও তারা অবগত ছিলেন, যেহেতু কুরআন-হাদীছ তাদের নিকটবর্তী সময়েই অবতীর্ণ হয়েছিল। হাদীছেও তাঁদের ব্যাপারে সম্মানজনক ইশারা রয়েছে।

ইমাম বুখারী (৩৬৫১) ও ইমাম মুসলিম (২৫৩৩) ইবনে মাসঊদ থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “সর্বোত্তম মানুষ হচ্ছে- আমার প্রজন্ম। এরপর তাদের পরে যারা। এরপর তাদের পরে যারা। অতঃপর এমন কওম আসবে যাদের সাক্ষ্য হলফের পিছনে, হলফ সাক্ষ্যের পিছনে ছুটাছুটি করবে।”

ইমাম নববী (রহঃ) বলেন,
বিশুদ্ধ মতানুযায়ী নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রজন্ম হচ্ছে-ছাহাবায়ে কেরাম। দ্বিতীয় প্রজন্ম হচ্ছে- তাবেঈগণ। তৃতীয় প্রজন্ম হচ্ছে- তাবে-তাবেঈগণ (ইমাম নববী রচিত ছহীহ মুসলিমের ব্যাখ্যাগ্রন্থ [১৬/৮৫] থেকে সমাপ্ত)

হাফেয ইবনে হাজার বলেন,
হাদীছের বাণী: “এরপর তাদের পরে যারা” অর্থাৎ তাদের পরের প্রজন্ম। তারা হচ্ছেন- তাবেঈগণ। “এরপর তাদের পরে যারা”। তারা হচ্ছেন- তাবে-তাবেঈগণ। ফাতহুল বারী (৭/৬) থেকে সমাপ্ত।

ক্বারী (রহঃ) বলেন,
সুয়ুতী বলেন, বিশুদ্ধ মতানুযায়ী এটি অর্থাৎ প্রজন্ম বিশেষ কোন সময়সীমাতে আবদ্ধ নয়। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রজন্ম হচ্ছে- ছাহাবায়ে কেরাম। নবুয়তের শুরু থেকে সর্বশেষ ছাহাবীর মৃত্যু পর্যন্ত ১২০ বছর এ প্রজন্মের সময়কাল। তাবেঈ-প্রজন্মের সময়কাল ১০০ হিঃ থেকে ৭০ বছর। আর তাবে-তাবেঈ প্রজন্মের সময়কাল এরপর থেকে ২২০ হিঃ পর্যন্ত। এ সময়ে ব্যাপকভাবে বিদ'আতের উদ্ভব ঘটে। মুতাযিলারা তাদের মুখের লাগাম খুলে দেয়। দার্শনিকেরা মাথা ছাড়া দিয়ে উঠে। দ্বীনদার আলেমগণকে “কুরআন আল্লাহর সৃষ্টি” এই মতবাদ মেনে নেয়ার জন্য চাপ দেয়া হয়। এভাবে গোটা পরিস্থিতি ওলট পালট যায়। এভাবে আজ অবধি দ্বীনদারি হ্রাস পেতেই আছে। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বাণীর বাস্তব নমুনা যেন ফুটে উঠেছে- “এরপর মিথ্যা ব্যাপক হারে দেখা দিবে”। ‘মিরকাতুল মাফাতীহ’ (৯/৩৮৭৮) গ্রন্থ থেকে সমাপ্ত।

ঐ সকল আলেমদের আমার বেশি ভাল লাগে যারা কুরআন ও হাদীছ বর্ণনা করেন আর পাশাপাশি কুরআনের উক্ত আয়াত ও হাদীছের ব্যাপারে সালফে-সালেহীনের বুঝ কি ছিল তাও বর্ণনা করেন। যেমনঃ ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের এরূপ অর্থ করেছেন, সাঈদ ইবনে যুবায়ের (রহঃ)-এর এরূপ মত ছিল, ইমাম মালেক (রহঃ)-এর এরূপ মত ছিল ইত্যাদি।

যারা জীবনের সর্বক্ষেত্রে সালফে-সালেহীনের বুঝ অনুযায়ী চলবেন, তারা গোমরাহী হতে বেঁচে থাকবেন। এই বুঝ না নিলে পথভ্রষ্ট হতে হবে। অতীতে এরূপে বহু দলের সৃষ্টি হয়েছে, যেমনঃ শী'আ, খারেজী, মু'তাজিলা, জাহমীয়া, কাদরিয়া, জাবরিয়া, কাররামিয়া ইত্যাদি। আর বর্তমানে এদের নতুন সংস্করন প্রকাশিত হচ্ছে। কুরআন-হাদীছ নিজে নিজে বুঝতে গেলে পথভ্রষ্ট কিভাবে হতে হয়, তার একটি ছোট্ট উদাহরণ দিচ্ছি। যেমনঃ কতিপয় লোক বিশ্বাস করে যে, "নবীদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। সব নবী একই স্তরের এবং একই মর্যাদার"! তারা দলীল দেয় কুরআনের এই আয়াতঃ ‘‘আমরা তাঁর (আল্লাহর) রাসূলের মাঝে কোন পার্থক্য করি না’’ (সূরা বাকারাঃ২৮৫)। অথচ, এই আয়াতে উল্লেখিত পার্থক্য না করা দ্বারা উদ্দেশ্য হ’ল, ‘‘ঈমান আনয়নের ক্ষেত্রে পার্থক্য না করা, অর্থাৎ সকলের প্রতি ঈমান আনা’’।

আলহামদুলিল্লাহ,বর্তমানের সালাফী/আহলুল হাদীছ গণ সালফে-সালেহীনের নীতিরই অনুসারী (ইনশাআল্লাহ)।
[sourse-sgis-copy]