হানাফী ফিকহের সনদ নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা। (পর্ব নং-১)
** জনাব আব্দুল মালেক সাহেব হানাফী ফিকহের সনদ প্রকাশ করেছেন। আজ হতে ১ বছর আগে উলুমুল হাদীছে পড়েন এমন এক দেওবন্দীর সাথে আমার বাহাছ হয়। তিনি এই একই সনদটি আমাকে হাদিয়া দিয়েছিলেন। যাই হোক, হানাফী ফিকহের সনদের ২৯ নং-এ ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে হাসান আশ-শাঈবানীর নাম দেয়া হয়েছে। তিনি ইমাম আবু হানীফার ছাত্র ছিলেন। ইমাম আবু ইউসুফের পরই তার অবস্থান । তার সম্পর্কে মুহাদ্দিছদের বক্তব্য নিয়ে বহু দিন আগে একটি স্টাটাস দিয়েছিলাম। আজকে সেই স্টাটাসটি আবারও প্রদান করলাম। আপনারা এতেই হানাফী ফিকহের সনদে থাকা ইমাম মুহাম্মাদ সম্পর্কে আন্দাজ করতে পারবেন। যদি আরো লাগে তবে বলবেন ইনশা আল্লাহ আরো যোগ করে দেয়া যাবে।সনদে থাকা অন্যান্য ব্যক্তিরদের অবস্থাও করুন। তাদের সম্পর্কে ধীরে ধীরে বলার ইচ্ছা রাখি। যদিও তার দরকার হবে না বলে মন করি। আসলে ছাই দিয়ে আদৌ দড়ি পাকানো যায় না।
সেই পোস্টটি ছিল নিম্নরুপ:
** রসুল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিন রাকাত বিতর ছালাতের দ্বিতীয় রাকাতে সালাম ফেরাতেন না ।{নাসাঈ,হা/১৬৯৮}
তার মানে তিনি ২য় রাকাতে বসতেন মাগার সালাম না ফিরিয়ে উঠে যেতেন ।নবীজির নামাজ বইটাতে হাদীছটি আনা হয়েছে। পৃ: নং-২৪৮ দেখুন।
হাদীছটি ছহীহ হাদীছের বিপরীত হওয়াতে শায হয়েছে যা যঈফ হাদীছ । তাছাড়াও এর সনদে কাতাদা নামক একজন প্রসিদ্ধ মুদাল্লিস রাবী আছেন ।আর মুদল্লিস রাবী আন আন শব্দে হাদীছ র্বণনা করলে তা গ্রহণ করা হয় না । তার মুদাল্লিস হবার প্রমাণঃ
১. তিনি মুদাল্লিস রাবী ।{আত-তাবয়ীন,রাবী নং-৬৩৭}
২.তিনি তাদলীস করতেন ।{আল-মুদাল্লিসীন,রাবী নং-৪৯}
৩.তিনি প্রসিদ্ধ তাদলীসকারী ।{সুওয়ালাতে তিরমিযী,১/২৩৯}
৪.তিনি মাশহুর মুদাল্লিস ।{জামেউত তাহছীল,রাবী নং-৬৩৩}
৫. তিনি তাদলীসকারী হিসেবে প্রসিদ্ধ ।{তাবাকাতুল মুদাল্লিসীন,রাবী নং-৯৩}
৬.ইমাম আহমাদ এই সনদেকে যঈফ বলেছেন ।{নাইলুল আওতার,হা/৯২২}
৭. ত্বাউস এই কাতাদা হতে পালিয়ে থাকতেন ।{তাহযীবুত তাহযীব,রাবী নং-৬৩৭}
৮.তাকে কাদরীয়া হবার অপবাদ দেয়া হয়েছিল ।{তাহযীবুত তাহযীব,রাবী নং-৬৩৭; এই তথ্য সত্য নয় বলে অনুমিত হচ্ছে}
আলবানী হাদীছটিকে শায বলেছেন ।
**বিতরের তিন রাকাত ছলাতে দু রাকাত পড়ার পরে তাশাহহুদের জন্য বৈঠক করা এবং শুধু তাশাহহুদ পড়ে দাড়িয়ে যাওয়ার পক্ষে কিছু হাদীছ পেশ করা হয় । যেমনঃ বিতর ছলাত মাগরিবের ন্যায়। {মুয়াত্তা মুহাম্মাদ,হা/২৬১,২৬২,২৬৫,১২৩}
অর্থ্যাত, মাগরিবের ছলাতে যেভাবে দুরাকাত পড়ার পরে তাশাহুহদে আত তাহিয়াতু পাঠ করা হয় তেমনিভাবে বিতর ছলাতেও দু রাকাত পড়ার পরে তাশাহহুদে বসতে হবে এবং কেবল আত-তাহিয়াতু পাঠ করার পরে তৃতীয় রাকাতের জন্য দাড়াতে হবে ।
মুয়াত্তার উক্ত হাদীছসমুহের সনদগুলো মুহাম্মাদ ইবনে হাসান বর্ণণা করেছেন । তার সম্পর্কে ইমামদের মতামতঃ
১. তিনি কিছুই নন। {আয-যুআফা আল কাবীর,উকাইলী,রাবী নং-১৬০৭}
২. ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন বলেনঃ তিনি কিছুই নন । {তারীখে ইয়াহইয়া,রাবী নং-১৭৭০}
৩. অন্য স্থানে ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন তাকে কাযযাব বলেছেন ।{আল-মাজরুহী, রাবী নং-৯৬৭}
৪.তিনি মুরজিয়া এবং মুরজিয়া আকীদার প্রতি আহ্বান করতেন । {ঐ}
৫. ইবনে সাদ আওফী বলেন: আমি ইয়াহইয়া ইবনে মাঈনকে তাকে কাযযাব বলতে শুনেছি ।{ঐ,রাবী নং-৯৬৭}
৬. ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল বলেছেনঃ তিনি কিছুই নন । {ঐ,রাবী নং- ৯৬৭}
৭. তার বর্ণিত হাদীছ লিপিবদ্ধ করা যাবে না । {ঐ,রাবী নং-৯৬৭}
৮.তিনি হাদীছ বর্ণনায় কিছুই নন। {তারীখে আসমা ওয়াল কাযযাবীন,রাবী নং- ৫৩৬}
৯. ইমাম আবু দাউদ বলেনঃ তার হাদীছ লেখা যাবে না । {তারীখে বাগদাদ.২/১৭৭}
১০.তার হেফয শক্তি দুর্বল হওয়ার কারণে তাকে ইমাম নাসাঈ দুর্বল বলেছেন ।{আল মুগনী,রাবী নং-৫৪০৩}
১১.তার হেফয় শক্তি দুর্বল হবার কারণে ইমাম নাসাঈ এবং অন্যান্য মুহাদ্দছিগণ তাকে যঈফ বলেছেন ।{মাআনিল আখবার,রাবী নং-৪৩৮}
১২.ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল বলেনঃ আমি তার হতে কিছুই বর্ণনা করি না । {মাওসুআতে আকওয়ালিল ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল,রাবী নং-২৩০৬}
সুতরা, মুয়াত্তা মুহাম্মাদের বর্ণিত কোন হাদীছ সাক্ষী ছাড়া বর্ণণা করা যাবে না ।
** এক সাথে তিন রাকাত বিতর পড়ার দলীলঃ
১.তিন রাকাত বিতরে রসুল ছল্লাল্লাহু আলাইহি শেষের বৈঠক ছাড়া বসতেন না । {বাইহাকী,হা/ ৪৮০০;সনদ ছহীহ}
“তিনি বসতেন না”- অংশকে বাদ দিয়ে “তিনি সালাম ফেরাতেন না”- কথাটি ঢুকানো হয়েছে । আগেকার মুহাদ্দিছগণ “তিনি বসতেন না”-কথাটিই উল্লেখ করেছেন ।{হাকেম,হা/ ১১৪০}
২. রসুল ছা.- তিন রাকাত বিতর পড়তেন এবং মাঝে বসতেন না। {আব্দুর রাজ্জাক,হা/৪৬৬৯}
৩.তিন রাকাত বিতরে রসুল ছা.- শেষের রাকাত ছাড়া বসতেন না ।{মারফোতুস সুনান,হা/১৪৭১}
৪. রসুল ছা.- তিন রাকাত বিতর পড়তেন এবং মাঝে বসতেন না ।শেষ রাকাত ব্যতিরেকে তাশাহহুদে বসতেন না । {হাকেম,হা/১১৪২}
৫.রসুল ছা.- সরাসরি আদেশ করেছেনঃ তোমরা মাগরিবের মত করে বিতর আদায় করো না। {তাহাবী,হা/১৭৩৯}
** তবে তিন রাকাত বিতরে যদি দ্বিতীয় রাকাতে তাশাহহুদে বসেন তবে সকল দুআ-দুরুদ পাঠ করার পরে সালাম ফিরাবেন। অতঃপর নতুন করে আরেক রাকাত পড়ার দ্বারা তিন রাকাত বিতর সমাপ্ত করতে হবে । {বুখারী,হা/৯৯১}
** এক রাকাত বিতর পড়ার দলীল সমুহঃ
১.রসুল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাতে এক রাকাত বিতর পড়তেন । {বুখারী,হা/৯৯৫}
২. বিতর এক রাকাত শেষ রাতে । {মুসলিম,হা/১৭৯৩}
৩. রাতের ছলাত দু দু রাকাত করে । যদি ফজর হবার আশঙ্কা থাকে তবে এক রাকাত বিতর পড়ে নিতে হবে । {বুখারী,হা/৯৯০}
৪.রসুল ছা.- এক রাকাত দ্বারা বিতর পড়তেন । {মিশকাত,হা/ ১২৮৫}
এক রাকাত বিতর পড়ার হাদীছগুলোক অপব্যাখ্যা করে বাদ দেবার চেষ্টা করা হয় । এমন কিছু ব্যাখ্যা প্রদান করা হয় যা কোন ছেক্বাহ ইমাম প্রদান করেন নি । তবে মাযহাব টেকানোর জন্য নতুন নতুন ব্যাখ্যা আমদানী করা পুরাতন আমল । আর আহলে রায়গণ হাদীছ বর্ণনা না করলেই বরং ভালো হত ।
** দু রাকাত পড়ার পরে বৈঠকে বসে কেবল আত-তাহিয়াতু পাঠ করা অতঃপর দাড়িয়ে যাবার কোন ছহীহ রেওয়াত নেই । ইবনে আবী শাইবাহ (হা/৬৭১৫),মাআনিল আছার (হা/১৭৪৪),মুজামুল আওসাত (হা/৭১৭০),মুজামুল কাবীর (হা/৯৪২০-২১),সুনানে ছগীর (হা/৭৮০)-সহ তিন রাকাত বিতরে দু রাকাতে শুধু আত-তাহিয়াতু পাঠ করার যত দলীল পেশ করা হয় সবই দুর্বল ।
+++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++
হানাফীদের কথিত ফিকহ কমিটি। ( পর্ব নং- ২)
হানাফী ফিকহ কমিটিতে প্রথম যার নাম আসবে তিনি হলেন আসাদ বিন আমর আবুল মুনযির আল বাজালী।তিনি আবু হানীফা রহ.- এর শাগরিদ। তার বিষয়ে ইমামদের মতামতঃ
১. ইমাম আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বলেন, তিনি সত্যবাদী। তবে আবু হানীফার ছাত্রদের হতে হাদীছ বর্ণনা করা উচিৎ নয়।{ আল কামিল, রাবী নং- ২১৪ }
২. তিনি আবু হানীফার মাযহাবের পক্ষে্য হাদীছ বানাতেন। { আল মাজরুহীন,রাবী নং- ১১৭}
৩. ইমাম ইবনে আবু শাইবাহ বলেন, তিনি আর বাতাস সমান। { যিকরু মান ইখতালাফাল উলামা,১/ ৪১}
তার মানে তিনি হাদীছ বর্ণনায় গ্রহণযোগ্য নয়।
তার মানে তিনি হাদীছ বর্ণনায় গ্রহণযোগ্য নয়।
৪. ইয়াহইয়া ইবনে মাইন বলেছেন, তার হাদীছ বর্ণনায় সমস্যা নেই।{ তারীখে ইবনে মাইন, রাবী নং-১৭৬২}
৫. অন্যত্র ইবনে মাইন তাকে মহামিথ্যুক বলেছেন।{ আল কামিল, রাবী নং- ২১৪}
ইবনে মাইনের মিথ্যুক বলাই গ্রহণযোগ্য। কারণ এটা জারহ মুফাস্সার।
৬. তার হাদীছ লেখা যাবে না। { ঐ}
৭. তিনি কিছুই নন।{ ঐ}
৮. তিনি যইফুল হাদীছ। { আল জারহু ওয়াত তাদীল, ইবনে আবী হাতিম, রাবী নং- ১২৭৯}
৯. ইমাম বুখারী তাকে যইফ বলেছেন। { তারীখে কাবীর, রাবী নং- ১৬৪৬; আয যুয়াফাউল কাবীর, রাবী নং- ৩৪}
১০. ইমাম নাসাই তাকে শক্তিশালী নন বলেছেন। { আয যুয়াফা ওয়াল মাতরুকীন, রাবী নং- ৫৩}
ফিকহ কমিটি যখন প্রতিষ্ঠা হয় তখন তিনি দুনিয়ায় জন্ম নিয়েছিলেন কি না তা আল্লাহই জানেন। তার মৃঃ ১৯০ হিজরীতে। জন্ম সাল জানতে পারি নি।
No comments:
Post a Comment